শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশজুড়ে যখন ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে, তখন আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে দেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা এবং দণ্ড কার্যকরে বিলম্বের বিষয়টি। বিশেষ করে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর মামলা নতুন করে জনমনে প্রশ্ন তুলেছে— ভয়ংকর অপরাধের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি ও আদালতের রায় থাকার পরও কেন বছরের পর বছর ঝুলে থাকে বিচার?
রসু খাঁ বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত সিরিয়াল কিলার। ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার প্রায় ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে বন্দি রয়েছেন।
চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের বাসিন্দা রসু খাঁ প্রথম জীবনে ছিলেন একজন ছিঁচকে চোর। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর টঙ্গী এলাকায় একটি মসজিদের ফ্যান চুরির অভিযোগে তাকে আটক করে পুলিশ। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ সব তথ্য। রসু খাঁ স্বীকার করেন, তিনি একে একে ১১ জন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছেন। এমনকি তার লক্ষ্য ছিল ১০১ জন নারীকে হত্যা করা।
তদন্তে জানা যায়, প্রেমে ব্যর্থতা এবং এক পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে গণপিটুনির ঘটনার পর নারীদের প্রতি তার তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। এরপরই তিনি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন। বিয়ের প্রলোভন ও প্রেমের অভিনয় করে নারীদের ফাঁদে ফেলতেন এবং পরে নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যা করতেন।
তার শিকার হওয়া নারীদের বেশিরভাগই ছিলেন পোশাকশ্রমিক, যাদের বয়স ছিল ১৬ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর সদর ও হাইমচর এলাকায় এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। অনেক ভুক্তভোগীর পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় তদন্তে দীর্ঘ সময় লেগেছে বলে জানিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
রসু খাঁর বিরুদ্ধে মোট ১০টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ৯টি হত্যা মামলা এবং একটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা। ২০০৯ সালের ২০ জুলাই ফরিদগঞ্জের হাসা খালের পাশে পারভীন নামে এক পোশাকশ্রমিককে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ২০১৮ সালের ৬ মার্চ আদালত রসু খাঁসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তবে সেই রায়ের পরও এখন পর্যন্ত দণ্ড কার্যকর হয়নি। অন্য মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়াও এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি।
কারা সূত্রে জানা গেছে, ৫২ বছর বয়সী রসু খাঁ বর্তমানে শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন এবং কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ বন্দিদের মতোই খাবার পাচ্ছেন। তবে দীর্ঘ কারাবাসের এই সময়ে তার সঙ্গে দেখা করতে কোনো স্বজন বা পরিচিতজন কারাগারে যাননি বলেও জানা গেছে।
এদিকে সাম্প্রতিক শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর বিচার নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও সাজা কার্যকরে বিলম্ব অপরাধ দমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দ্রুত তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং রায় কার্যকরের দাবিও জোরালো হচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
মন্তব্য করুন