
প্রতিবেদন: [মোসলেম মোহাম্মদ ]
ভূমিকা
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি প্রবাসী শ্রমিক প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায়। কিন্তু তাদের জীবন আসলে কতটা সুখের? নাকি তারা কেবলই নিঃশব্দ কান্নার, হারানোর গল্পের অংশ?
প্রবাসজীবনের সূচনা: আশার আলো, অজানা ভয়
দেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতা, কর্মসংস্থানের অভাব, ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে হাজার হাজার তরুণ পাড়ি জমায় বিদেশের পথে। কেউ ধারদেনা করে, কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ আবার এনজিও বা এনজেল লোন নিয়ে পাড়ি দেয় অজানার উদ্দেশ্যে। এদের অনেকেই প্রতারিত হয় দালালের হাতে, পাসপোর্ট বা ভিসা জটিলতায় আটকে পড়ে বছরের পর বছর।
কাজের পরিবেশ: কষ্টের খনি
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত অনেক প্রবাসী শ্রমিক নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা বা ঘরের কাজ করেন। প্রতিদিন ১২-১৬ ঘণ্টা কাজ করা, তীব্র গরমে রোদের নিচে কাজ করেও না থাকা কোনো ছুটি, এমনকি ন্যায্য মজুরি না পাওয়াও এখানে স্বাভাবিক।
কুয়েতে থাকা এক বাংলাদেশি শ্রমিক বলেন:
“গরমে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেও উঠতে হয়। ওরা ভাবে, আমরা তো শ্রমিক—মেশিন না হইলে কী?”
আবাসন ও খাওয়ার সমস্যা
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রবাসীদের বসবাসের জায়গাগুলো হয় অস্বাস্থ্যকর ও গাদাগাদি করা। ৮–১০ জন একসাথে একটি ছোট্ট রুমে থাকতে বাধ্য হন। খাদ্যতালিকায় পুষ্টির অভাব, মসলার স্বল্পতা ও রান্নার সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেকেই পেটভরে খেতে পারেন না।
সৌদি আরব থেকে একজন প্রবাসী বলেন:
“মা যদি জিজ্ঞেস করে, খেয়েছিস? হ্যাঁ বলি। কিন্তু মাঝেমধ্যে একটুকরো রুটিও জোটে না।”
পারিবারিক দূরত্ব ও মানসিক চাপ
সবচেয়ে কষ্টদায়ক বিষয় হলো পরিবার থেকে দূরে থাকা। সন্তানের প্রথম হাঁটা, স্ত্রীর কান্না, বাবার মৃত্যুসংবাদ—সব কিছুই ফোনের এপারে থেকে দেখতে হয়। কেউ কেউ আবার বছরে একবারও দেশে ফিরতে পারেন না। এ দূরত্বই জন্ম দেয় মানসিক বিষণ্নতা, নিঃসঙ্গতা এবং আত্মহীনতায়।
সামাজিক অবহেলা ও ভুল মূল্যায়ন
অনেকেই মনে করে প্রবাসীরা টাকা গাছে ফলায়। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। অনেকে দেনায় ডুবে থাকে, দেশে ফিরে কর্মসংস্থানের অভাবে পথে বসে। তবুও দেশে ফিরে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে শুনতে হয়,
“তোর তো অনেক টাকা, বিদেশ থেকে এসেছিস।”
সফলতার গল্পের পেছনের অজানা কান্না
হ্যাঁ, কিছু মানুষ সফল হয়, বাড়ি বানায়, ব্যবসা করে। কিন্তু সাফল্যের চূড়ায় ওঠার আগে তারা কতো রাত না খেয়ে কেটেছে, কত অপমান সয়েছে—তা কেবল তারাই জানে। সোনার হরিণ খুঁজতে গিয়ে অনেকে লাশ হয়ে ফেরেন দেশের মাটিতে।
পরিশেষে
প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠায় না, তারা দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের অধিকাংশ সময় অবহেলাই করা হয়। তাদের জন্য পর্যাপ্ত দূতাবাস সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা ও দেশে ফিরে পুনঃসংস্থানের ব্যবস্থা জরুরি।
কারণ তারা শুধু টাকা পাঠায় না—তারা স্বপ্ন পাঠায়, তারা ভালোবাসা পাঠায়, তারা জীবন উৎসর্গ করে।
শেষ কথায়:
প্রবাসীরা যেন শুধু বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর যন্ত্র না হয়ে ওঠে। তাদের দুঃখকে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করলেই তারা পরিপূর্ণভাবে সম্মানিত হতে পারে।
মন্তব্য করুন