
শিক্ষকের হাতে থাকবে কুরআন ও কলম—শিশুর শরীরে আঘাতের দাগ কেন? নববী আদর্শ কি এটাই শেখায়?
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা | Hikma 24
কুরআন শিখবে, দ্বীন শিখবে, আদব-আখলাক শিখবে—এই বিশ্বাসেই একজন মা তার আদরের সন্তানকে মাদ্রাসার শিক্ষকের হাতে তুলে দেন। সেই সন্তান যখন বাড়ি ফিরে আসে হাতে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে, তখন একজন মায়ের হৃদয়ে কী ঘটে—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরে তাফিজুল উম্মাহ কওমী মাদ্রাসার এক শিশুশিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসার এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
শিশুটির মা জানিয়েছেন, গতকাল মাদ্রাসার ওই শিক্ষক তার সন্তানকে মারধর করেছেন। পরিবারের দেওয়া ছবিতে শিশুটির হাতে একাধিক দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।
অভিযোগটি সত্য হলে প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুতর—শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার অর্থ কি তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন রেখে দেওয়া?
একজন শিক্ষক ভুল করলে শাসন করবেন, বুঝিয়ে বলবেন, সংশোধনের চেষ্টা করবেন। কিন্তু শিশুর শরীরে দৃশ্যমান আঘাত রেখে দেওয়ার অভিযোগকে সাধারণ “শাসন” বলে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
মাত্র কয়েক দিন আগেই কওমি মাদ্রাসায় শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ
ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ দেশের ছয়টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ড ও তাদের অধিভুক্ত মাদ্রাসার উদ্দেশে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক শাস্তি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার নির্দেশনা জারি করেছে।
অর্থাৎ কওমি মাদ্রাসার নিজেদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানও যখন শিশুদের ওপর শারীরিক শাস্তি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে, তখন এমন অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে।
রাসূল ﷺ-এর শিক্ষা ছিল রহমতের শিক্ষা
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ শিশুদের ভালোবাসতেন, তাদের কাছে টেনে নিতেন, কোলে নিতেন এবং চুমু দিতেন।
একবার রাসূল ﷺ হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে চুমু দিলে আকরা ইবনে হাবিস বললেন, তাঁর দশ সন্তান আছে, অথচ তিনি কাউকে চুমু দেননি।
তখন রাসূল ﷺ বললেন—
مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ
“যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।”
—সহিহ বুখারি, ৫৯৯৭
আর আনাস (রা.) প্রায় দশ বছর রাসূল ﷺ-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূল ﷺ তাঁকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলেননি; কোনো কাজের জন্য কঠোরভাবে “কেন করলে?” বা “কেন করলে না?” বলেও তিরস্কার করতেন না।
এটাই ছিল নববী শিক্ষা—রহমত, ধৈর্য, ভালোবাসা ও চরিত্র গঠন।
একজন শিশুর শরীর ছোট—তার হৃদয়ও কোমল
শিশু ভুল করবে। পড়া ভুলে যাবে। কখনো দুষ্টুমি করবে। এটাই শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার অংশ।
একজন শিক্ষকের দায়িত্ব সেই শিশুর ভুল সংশোধন করা—ভয় দেখিয়ে তার মন ভেঙে দেওয়া নয়।
বিশেষ করে একজন দ্বীনি শিক্ষককে শিশুরা শুধু শিক্ষক হিসেবে দেখে না; তার কাছ থেকেই তারা ইসলাম, কুরআন এবং নবী ﷺ-এর চরিত্র সম্পর্কে ধারণা নেয়।
তাই একজন দ্বীনি শিক্ষকের আচরণে যদি শিশুর মনে মাদ্রাসা, শিক্ষক কিংবা দ্বীনি শিক্ষার প্রতিই ভয় জন্মায়, তাহলে এর ক্ষতি শুধু শরীরের একটি আঘাতের দাগে সীমাবদ্ধ থাকে না।
আইনও শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে হালকাভাবে দেখে না
বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩-এর ৭০ ধারায় দায়িত্ব বা পরিচর্যায় থাকা শিশুকে আঘাত বা উৎপীড়নের ফলে নির্দিষ্ট ধরনের শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার বিধান রয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
মাদ্রাসা কোনো শিশুর আতঙ্কের জায়গা হতে পারে না।
মাদ্রাসা হবে এমন জায়গা, যেখানে একটি শিশু কুরআনকে ভালোবাসতে শিখবে, শিক্ষককে শ্রদ্ধা করতে শিখবে এবং রাসূল ﷺ-এর রহমত ও উত্তম চরিত্র নিজের জীবনে ধারণ করতে শিখবে।
একজন মা তার সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠান মানুষ হওয়ার জন্য—আঘাতের দাগ নিয়ে ঘরে ফেরার জন্য নয়।
Hikma 24-এর আহ্বান
শিশুকে ভালোবাসুন। ভুল করলে বুঝিয়ে দিন। তার ছোট্ট শরীর ও কোমল মনকে শাস্তির লক্ষ্য বানাবেন না।
কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন—
“যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।”
—Hikma 24
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা
মন্তব্য করুন