গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ লাখ কোটি টাকা, বিদেশে অবৈধভাবে পাচার হয়েছে।
বুধবার (১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান। সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম।
প্রধানমন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।
তিনি বলেন, পাচার হওয়া এই অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে অর্থ উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থ পাচারের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশগুলো হলো—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চীন।
তিনি বলেন, এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (এমএলএটি) স্বাক্ষরের বিষয়ে ইতোমধ্যে সম্মতি পাওয়া গেছে। বাকি সাতটি দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্সের চিহ্নিত অগ্রাধিকারভিত্তিক ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব মামলার অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।
সম্পদ জব্দের তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদালতের নির্দেশে দেশে মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার সম্পদ সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এখন পর্যন্ত ১৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ছয়টি মামলার রায়ও দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং ও আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন