ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তপশিল প্রকাশের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আজ বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন এবং অন্যান্য চার নির্বাচন কমিশনার। তাদের ভাষণও আজই রেকর্ড হওয়ার কথা এবং সন্ধ্যার পর জাতির উদ্দেশে এই ভাষণ সম্প্রচার করা হতে পারে। যদি কোনো কারণে তা সম্ভব না হয়, তাহলে বৃহস্পতিবার প্রচার করা হবে বলে জানা গেছে।
সমাবেশে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান
তপশিল ঘোষণার পর অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের সমাবেশ বা আন্দোলন না করার অনুরোধ জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, অনুমোদনহীন জনসমাগম বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনী, বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনী, নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা বজায় রাখতে মাঠে থাকবে। এবার প্রায় ৯ লাখ সদস্য দায়িত্বে থাকবেন, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট
সরকার আগেই জানিয়ে দিয়েছে, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। সেই অনুযায়ী তপশিলও প্রস্তুত করা হয়েছে। ভোটগ্রহণ সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে শুরু হয়ে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলবে।
তপশিলের পর কঠোর নির্বাচন–নিয়ম
ইসি কর্মকর্তারা জানান, তপশিল ঘোষণার পর নির্বাচনী সমাবেশ ও প্রচারণায় নিয়ম কড়াকড়ি থাকবে। সমাবেশ করতে চাইলে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে পুলিশকে জানাতে হবে। মনোনয়ন জমা, যাচাই–বাছাই, প্রত্যাহার ও প্রতীক বরাদ্দ শেষে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারে অংশ নিতে পারবেন। পাঁচ শতাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে নামবেন।
সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী এবার তপশিল ঘোষণার পর থেকেই সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা পাবেন। কিছু কর্মকর্তা আবার ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।
সিইসির ব্যস্ততা
তপশিলের প্রস্তুতি পর্যালোচনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সিইসি ইতোমধ্যে বৈঠক করেছেন। আজ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকের পর ভাষণের রেকর্ড সম্পন্ন হবে।
ইতিহাসে প্রথমবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসাথে
বাংলাদেশে আগেও দুইবার গণভোট হয়েছে, কিন্তু একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট এবারই প্রথম। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রথমবারের মতো ডাকযোগে (postal) ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
দলীয় অংশগ্রহণ
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ৫০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগের দলীয় নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তারা অংশ নিতে পারছে না। জাতীয় পার্টি ভোটে অংশ নিলেও দলটির একটি অংশ নতুন জোট গঠন করেছে। গত সপ্তাহে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি পৃথকভাবে সিইসির সঙ্গে বৈঠক করে তপশিল ঘোষণায় সম্মতি জানিয়েছে, যদিও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত না হওয়া নিয়ে কিছু দল অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের অসুস্থতা ইস্যু
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কারণে তপশিল ঘোষণা বিলম্বিত হতে পারে—এমন আলোচনা থাকলেও বিএনপি ইসিকে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে বলে কমিশন সূত্র জানিয়েছে।
বিস্তৃত ভোটার তালিকা ও ভোটকেন্দ্র
দেশে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এ জন্য ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র এবং প্রায় আড়াই লাখ ভোটকক্ষ থাকবে। প্রতি কেন্দ্রে গড়ে তিন হাজার ভোটার থাকবে। নারী ভোটারদের জন্য পৃথক কক্ষের সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী ভোটার ডাকযোগে ভোট দিতে পারবেন, যার জন্য ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন চলবে।
পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা
দেশী–বিদেশী পর্যবেক্ষকদের জন্য আলাদা গাইডলাইন তৈরি হয়েছে। ৫৭টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও ৮১টি স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থা এবার পর্যবেক্ষণে যুক্ত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও পর্যবেক্ষণ করবে।
ইসির চেকলিস্ট প্রস্তুত
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, তপশিল ঘোষণার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তপশিল ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগাম প্রচারের সব সামগ্রী সরাতে হবে, নইলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চ্যালেঞ্জ দেখছেন না কমিশনার মাছউদ
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও নির্বাচন আয়োজন নিয়ে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। কমিশনের লক্ষ্য—আইন মেনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
মন্তব্য করুন