Alam
১০ অক্টোবর ২০২৫, ৪:৫৪ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৩৯ জন

সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোটে ইতিবাচক ইসি কর্মকর্তারা

জুলাই সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গঠিত হয়েছে। তবে এই গণভোট জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একসঙ্গে হবে, নাকি আগে বা পরে— সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। একই সঙ্গে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) এই গণভোট আয়োজনের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, তারা আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি আগে থেকেই নিচ্ছেন। যদি সরকার গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে নতুনভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে, যদিও এতে বড় কোনো জটিলতা দেখা দেবে না বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

গত বুধবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পঞ্চম দফা বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে সম্মত হয়। বৈঠক শেষে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বিশেষজ্ঞরা সর্বসম্মতভাবে মত দিয়েছেন যে, সনদ বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে একটি আদেশ জারি করে গণভোট আয়োজন করতে হবে।

তবে গণভোটের সময় নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ জাতীয় নির্বাচনের একই দিনে ভোট আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন, আবার কেউ এক মাস আগে গণভোট করার পক্ষে মত দিয়েছেন। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন আগেই গণভোটের বিধান সংসদে উত্থাপন ও পাস করার সুপারিশ করেছিল।

ইসির অবস্থান

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “গণভোটের বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা ইনশাআল্লাহ সেটি আয়োজন করতে পারব।”

তিনি আরও বলেন, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হলে খরচ অনেকটা কমে যাবে। “দুই দিন ভোট আয়োজন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল হবে,” মন্তব্য করেন তিনি।

ইসি সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এতে ১২ কোটি ৬৩ লাখের বেশি ভোটার, ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্র এবং আড়াই লক্ষাধিক ভোটকক্ষ থাকবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটগ্রহণের জন্য প্রথমবারের মতো ‘আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট’ ব্যবস্থাও চালু হচ্ছে, যার জন্য আলাদা ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট আয়োজন করলে অতিরিক্ত কিছু অর্থ যোগ করলেই ব্যয়ভার সামলানো যাবে। কিন্তু আলাদা দিনে আয়োজন করতে হলে পুরো আয়োজনের ব্যয় দ্বিগুণ হবে।

গণভোটের বিধান ও ইতিহাস

গণভোট হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান ছিল না। ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান যুক্ত করেন।

পরে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়ে আদালত ১৪২ ধারাটি বাতিল করে পুনরায় গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে—

১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে প্রথম গণভোটে ৯৮.৮% ভোট পড়ে ‘হ্যাঁ’-তে।

১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপতি এরশাদের সময়ে দ্বিতীয় গণভোটে ৯৪.১১% ভোট পড়ে ‘হ্যাঁ’-তে।

১৯৯১ সালে সংসদীয় বনাম রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা নির্ধারণে তৃতীয় গণভোট হয়, যেখানে ৮৪% ভোটার সংসদীয় ব্যবস্থার পক্ষে রায় দেন।

আইনগত প্রশ্ন ও বিশেষজ্ঞ মত

গণভোটের বিধান আদালতের রায়ে ফিরলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে কার্যকর হবে কিনা— এ বিষয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। ১৮৯৭ সালের জেনারেল ক্লজ অ্যাক্টের ৬ ধারা অনুসারে কোনো বিলুপ্ত আইন পুনরুজ্জীবিত করতে হলে সংসদে পুনরায় তা পাস করানোর প্রয়োজন হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

তবে সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, “গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনতে এখন কোনো আইনি বাধা নেই। আদালতের রায় অনুযায়ী সরকার চাইলে সরাসরি গণভোট আয়োজন করতে পারে।”

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদও একই মত দেন। তিনি বলেন, “সরকার বা ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্ত এলে ইসি আইনগতভাবে তা বাস্তবায়ন করতে পারবে।”

এক দিনে দুই ভোট: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

একসঙ্গে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের বিষয়ে ইসি কমিশনার মাছউদ বলেন, “ভোটকেন্দ্র, রিটার্নিং অফিসার, ভোটকর্মী— সব এক থাকবে। শুধু দুটি ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হবে— একটি সংসদ নির্বাচনের জন্য, অন্যটি গণভোটের জন্য।”

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আবদুল আলীম বলেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত হলে ইসির জন্য এটি চ্যালেঞ্জিং হবে না। তিনি মনে করেন, “মানুষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একাধিক ব্যালট পেপারে ভোট দিতে অভ্যস্ত। সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানো গেলে কোনো সমস্যা হবে না।”

অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, “পৃথিবীর বহু দেশেই সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হয়। বাংলাদেশেও একই দিনে আয়োজন করা হলে ভোটারদের বিভ্রান্তি কমবে।”

ইসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব মিহির সারওয়ার মোর্শেদ, যিনি ১৯৯১ সালের গণভোটে দায়িত্বে ছিলেন, বলেন, “তখন জাতীয় নির্বাচন শেষে গণভোট হয়েছিল। এবার একসঙ্গে করা গেলে সময় ও অর্থ— উভয়ই সাশ্রয় হবে।”

সারসংক্ষেপ:
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হলেও সময়সূচি নির্ধারণ ও আইনগত প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একত্রে গণভোট আয়োজনের সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিকল্প।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি: বিচার বিভাগ এখন পুরোপুরি স্বাধীন

একইদিনে গণভোটের সিদ্ধান্ত কারো কুপরামর্শে হয়েছে: মিয়া গোলাম পরওয়ার

গণভোটের জন্য ভোটকেন্দ্র বাড়ানোর প্রয়োজন নেই: ইসি সচিব

ইসলামী সমমনা আট দলের নির্বাচনি ঐক্য জোরদার, আসন নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি

মাদারীপুরে নিখোঁজ গৃহবধূ ইমা আক্তারের সন্ধান চায় পরিবার

বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় সিলেটে এনসিপির দোয়া মাহফিল

আপনাদের নিয়েই উন্নত শরীয়তপুর গড়ে তুলব

ফাঁকা আসনে শরিক দলের প্রার্থী না থাকলে, আমাদের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হবে

নির্বাচন করতে চাইলে উপদেষ্টাদের এখনই পদত্যাগ করা উচিত: সাইফুল হক

যখন বুঝবো সব ঠিক আছে, তখন তারেক রহমান দেশে আসবেন: দুদু

১০

উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভা, খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া

১১

খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা

১২

গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হবে: শিশির মনির

১৩

ধর্মীয় জ্ঞান না থাকলে শরীয়ত সম্পর্কিত ব্যাখ্যা বা মন্তব্যে না জড়ানোর আহ্বান ধর্ম উপদেষ্টার

১৪

জামায়াতে ইসলামীর চাঁদাবাজি–দুর্নীতি করার অভিজ্ঞতা নেই: ডা. শফিকুর

১৫

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা

১৬

বিএনপি প্রার্থী বুলেট দিয়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চান: জামায়াত আমির

১৭

বিশ্বে প্রথম এক ডোজের ডেঙ্গু টিকা অনুমোদন দিল ব্রাজিল

১৮

ঢাকা ও আশেপাশে আবারও মৃদু ভূমিকম্প, উৎপত্তি নরসিংদীর ঘোড়াশাল

১৯

সিলেটে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত

২০